বার্ষিক কার্য্য-সমীক্ষা

আমাদের রিজনাল ম্যানেজার গোয়েল সাহেব খুব নিয়মনিষ্ঠ ব্যক্তি। সব কাজ উনি এক প্রণালীবদ্ধ ভাবে করেন। শৃঙ্খলার হেরফের হতে পারবে না। টেকো মাথায় যে কয়েকটি চুল আছে তাদেরও যেন একটুও নড়ার অনুমতি নেই। রোজ উনি জেল লাগান আর তারপরে দিনে প্রায় সাত-আঠবার চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে নেন। উনি যদি কখনো ছুটি যান, তাহলে ওনার PA সব খবরের কাগজ, হেড অফিসের ডাক, চিঠি ইত্যাদি কালানুক্রমিকভাবে সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে। ছুটি থেকে আসার পর, গোয়েল সাহেব সব সেই অনুক্রমে দেখবেন আর পড়বেন। অনুক্রমের উনি কখনো হেরফের করেন না। উনি বলেন নিয়মাবদ্ধ জীবন নাকি মানুষের সাফল্যের কারণ।

ওনার আরেকটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে। ওনাকে আমরা যে কোন চিঠি দিই না কেন, উনি সেটাকে একবার ভালো করে পড়ে তারপরে ওনার দেরাজে রেখে দেন। পরের দিন সকালে সেই সব চিঠিগুলো একবার বার করে পড়েন এবং তারপরে সই করে পিওনকে ডেকে দিয়ে দেন ডেস্পাচ সেকশনে পোস্ট করে দেবার জন্য। আপনারা অনেকেই বলবেন যে এটা খুব ভালো অভ্যাস। কিন্তু এতে আমাদের মতো তার অধীনস্থ ম্যানেজারদের অসুবিধাই হয়। কিন্তু বড়ো সাহেব কিছু বলা যাবেনা, আমাদের নিজেদেরকে ওনার তালে তাল মেলাতে হবে। “মিলে সুর মেরা তুমারা…”

আমরা গোয়েল সাহেবের ড্রাইভার রাম প্রসাদের কাছ থেকে গোপনে জানতে পারি যে দিওয়ালীতে যে ম্যানেজাররা তাকে উপহার পাঠান উনি সেইগুলো সব শৃঙ্খলা অনুযায়ী নথি করেন। সব উপহারগুলো একটা একটা করে খোলা হয়, তারপরে সব আলাদা-আলাদা করে রাখা হয়। গোয়েল সাহেব নিজে একটা তালিকা তৈরি করেন এবং নোট করেন কে কি উপহার পাঠিয়েছে। ড্রাইফ্রুট সব বায়ুরোধী ডিব্বার মধ্যে ঢেলে রাখা হয়, আর প্লাস্টিকের ডিব্বাগুলো ষ্টোর-রুমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

একটা উপহারের প্যাকেট খুলে দেখলেন একটা সোনার চেন আছে। পাঠিয়েছেন পাশের এক শহরের ব্রাঞ্চের সিনিয়র ম্যানেজার গুপ্তাজী। সন্ধ্যাবেলায় বাজারে গিয়ে আমাদের ব্যাঙ্কের এক বিশিষ্ট স্বর্ণকার পার্টিকে গিয়ে দেখালেন আর carat কতো জিজ্ঞাসা করলেন। দোকানের মালিক এক কর্মচারীকে ডেকে চেক করতে বলেন। জানা গেলো সেটা ছিল ১৮ carat-এর। টাকলা গোলু মনে মনে মন্তব্য করলেন — “আচ্ছা গুপ্তা, তুনে হামসেহি কিয়া বানিয়াগিরি!” সাথে সাথে ওনার তালিকায় নথিভুক্ত হয়েগেলো গুপ্তা – রেটিং “B”।

আমরা গোয়েল সাহেবকে টাকলা, গোলু নামে ডাকি ওনার আড়ালে। সামনে বলার সাহস নেই। যদি একবার শুনে নেয় তাহলে তো নির্ঘাত কোন দূরের ব্রাঞ্চে পোস্টিং করে দেবেন।

আমাদের আরেক বড়ো ব্রাঞ্চের সিনিয়র ম্যানেজার সিং সাহেব। উনি সব সময়ে খুব ভালো গিফট নিয়ে আসেন। ওনার গিফট প্যাকেট খোলার সময়ে গোয়েল সাহেব সব সময় উৎসুক থাকেন। এক ট্রে ড্রাইফ্রুট আর পাশে দুই বোতল Antiquity Blue। বোতল গুলো দেখে গোয়েল সাহেবের মনটা খুশীতে ভরে গেলো। গোয়েল সাহেব বললেন — “Singh is king!” রেটিং “A”। গুপ্তার বানিয়াগিরির পরে গোয়েল সাহেবের মনটা একটু ক্ষুণ্ণ ছিল।

তারপরে খুললেন মাথুর সাহেবের গিফট। তার মধ্যে ছিল ড্রাইফ্রুটের ট্রে আর একটা সুন্দর cutlery সেট। গয়েল সাহেব ভাবলেন এই সব ছুরি-চামচ দিয়ে কি হবে? ধুর! কিন্তু পরমুহুর্তে মেমসাহেবের মুখে হাসি দেখে বুঝলেন যে তার খুব পছন্দ হয়েছে। যখন মেমসাহেবের মুখে হাসি তখন অগত্যা রেটিং “A” দিতেই হবে।

এবার খোলা হল শর্মাজীর গিফট প্যাকেট। যথারীতি ড্রাইফ্রুটের ট্রে আর ছিল সুটের কাপড়। ধুর! সুটের কাপড় অনেক পাওয়া যায়। আর একটা সিজনে কতো সুট পড়বেন? গোয়েল সাহেব ভাবছেন। তারপরে সুট সেলাই করাতে আজকাল প্রচুর টাকা চায়। শর্মাজীকে রেটিং “B”-এর চেয়ে বেশী দেওয়া যায়না।

এরপরে খুললেন মেহতাজীর গিফট বাক্স। বলা বাহুল্য ড্রাইফ্রুটতো ছিলোই আর সাথে ছিলো এক carton বিয়ারের can আর এক প্যাকেট তাস। গোলু আমাদের চিরকালের বিয়ারভক্ত। বিয়ার দেখে মনটা একেবারে গদগদ হয়ে গেলো। কিন্তু তাসের প্যাকেটটা দেখে মনে পড়ে গেলো গতবার উনি দিওয়ালীর রাত্রে তাসের খেলায় এই মেহতাজীর কাছে পাঁচ-হাজার টাকা হেরে গিয়েছিলেন। এখন গোয়েল সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন মেহতাজীকে কি রেটিং দেবেন? উনি এখনো নিশ্চয় করে উঠতে পারেন নি।

সত্যি, ম্যানেজারদের বার্ষিক কার্য্য সমীক্ষা করা কোন সরল ব্যাপার নয়! আপনারা একটু গোয়েল সাহেবকে মেহতাজীর রেটিং নিশ্চিত করতে সাহায্য করবেন কি?

2 thoughts on “বার্ষিক কার্য্য-সমীক্ষা

মন্তব্য দিন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: