একটি নষ্ট-মেয়ের ফোন নম্বর

সকাল সাড়ে নটার শান্তিপুর লোকাল এ দাঁড়িয়ে আছি, ঠাসাঠাসি ভীড়। ট্রেন এমনিতেই লেট করে চলছে। আমরা রোজ কল্যাণী লোকালে যাই, আজ ট্রেন লেট বলে শান্তিপুর ধরলাম। আমাদের একটা গ্রূপ আছে। আমি, সুদীপ, সৌরভ, শুভ আর রমেন দা। গ্রূপ এ রমেন দা ই মধ্যমনি। কাঁচড়াপাড়া থেকে উঠে শিয়ালদা পর্যন্ত নরক গুলজার করতে করতে চলা। এ ওর পিছনে লাগা। তার সাথে রমেন দার নানা রকম গল্প তো আছেই। লোকটি বেশ। আমুদে মানুষ, বেশ মেতে আছেন সব কিছু নিয়ে। সুদীপ বলল “রমেন দা, বৌদি নাকি কাল আপনাকে লাথি মেরে খাট থেকে ফেলে দিয়েছে।” অমনি শুভ পোঁ ধরলো , “ও তাই ভাবি রমেন দা আজ একটু লেংচে হাঁটছে কেন?” ব্যাস, ইয়ার্কি শুরু হয়ে গেল। রোজকার মত।

 হঠাৎ উল্টো দিকের দেয়ালে একটা লেখা চোখে পড়লো, হাতে লেখা, পার্মানেন্ট মার্কার দিয়ে। লেখাটা এরকম —

“সুন্দরী বান্ধবী চাই? সাথে মনের মত ট্যুর প্যাকেজ। আমি একজন কলগার্ল। এই নম্বরে যোগাযোগ করুন।”

পাশে একটা ফোন নম্বর দিয়ে ব্র্যাকেটে একটি নাম লেখা  — গীতা

এটা নিয়েই এবার গল্প শুরু হলো। সুদীপ বলল — “শালা এবার এই সব সেমি-প্রস গুলো ট্রেন এ ও ব্যবসা করা শুরু করেছে। যত্ত সব।” শুভ বললঃ “মাল কিন্তু পুরো খান…। কি বল রমেন দা? মালটাকে ফোন করা যাক, কি বলিস সবাই?” রমেন দা দেখলাম লেখাটার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বললাম “মালটা মনে হয় রমেন দার পুরোনো চেনা, দেখছিস না কেমন থম মেরে গেছে।”

রমেন দা বলল — “নারে সেসব কিছু না। তবে একটা পুরোনো ঘটনা মনে পড়ে গেল। এই লাইনেরই। তা প্রায় বছর দশেক আগের কথা।”

রমেন দা বলতে শুরু করলো। তখনও বিয়ে থা করিনি। টুকটাক এখানে ওখানে খেপ খেলে বেড়াচ্ছি। মেয়ে দেখলেই নোলা টা সকসক করে। কাজ বলতে তখন একটা ওয়াটার ফিল্টার কোম্পানি তে চাকরী করি, কলকাতাতেই। একটু আগে বেরোতে হত। গেদে ধরতাম। আমার সাথে কল্যানীর একটা ছেলের বন্ধুত্ব হল, সুব্রত —  সুব্রত মুখার্জী। সেও আমার মতোই একটা প্রাইভেট কোম্পানির চাকরি করে। তবে আমার থেকে এক কাঠি সরেস। কোথা থেকে একটা ভুয়ো প্রেস কার্ড ও বানিয়েছিল। আমরা এক ট্রেনই ধরতাম। সেদিন এমনই ট্রেন লেট, তো কৃষ্ণনগর ধরলাম। বুঝলি এরকম ই সেদিন দেখলাম,  কম্পার্টমেন্টে দেয়ালে মার্কার দিয়ে লেখা — “আমার নাম সুনীতা, শারীরিক সম্পর্ক করতে আগ্রহী যুবকরা ফোন করুন।” পাশে একটা ফোন নম্বর দেওয়া, ল্যান্ডলাইন ফোন। এদিকেরই হবে। আমার মাথায় বদবুদ্ধি ভীড় করলো, মালটাকে ফোন করে দেখলে হয়, একটু হ্যাজানোও যাবে। ভাবলাম ফোন করা যাক কিন্তু মনে একটা স্বাভাবিক সংকোচ বোধ কাজ করছে। কি দরকার? কি লাভ? যদি ভুল ভাল ব্যাপার হয়? যদি কোনো ট্র্যাপ হয়, এই সব আরকি। কিন্তু মনের মধ্যে একটা সাংঘাতিক কৌতুহল। অজানা সুনীতা নামে মেয়েটিকে দেখার একটা উদগ্র কৌতুহল কাজ করতে লাগলো। ভাবলাম একটা বুদ্ধি খাটাই। ট্রেন থেকে নেমে সুব্রত কে বললাম।  ওকে বলতেই ও লুফে নিল।  সুব্রত বলল —  “কখন ফোন করবি?”

“অফিস থেকে ফিরে, সাড়ে সাতটা নাগাদ।”

“শালা  কোনো খা…কি টাইপের মাগী হতে পারে, যদি দেখা করতে বলে।”

“দেখাই তো করতে চাই।”

“মালটা যদি মাল্লু চায়, কি করবি?”

“শোন দু’জনে যাবো, শ’পাঁচেক টাকা কাছে রাখবো। ঝামেলা হলে সালটে নেওয়া যাবে।”

“তো ঐ কথাই থাকলো, সাড়ে সাতটায় কল্যাণী স্টেশনে দেখা হবে।”

সারাদিন বিভিন্ন প্ল্যান ছকলাম। আগামী কাল শনিবার। অফিস ছুটি। দেখা করতে যাওয়া যেতে পারে। মনটা একটু আনচান করে উঠলো। ব্যাপারটায় একটু সেক্সএর গন্ধ আছে। তেমন হলে মালটাকে নিয়ে নাইট শো তে একটু সিনেমা দেখা, হলের ভিতরে অন্ধকারে একটু ছোঁয়া ছুঁয়ি তো চলতে পারে।

রাত পৌনে আটটা নাগাদ সুব্রত এসে পৌঁছল। ঠিক করলাম, একজন কথা বলবো। দেখা করতে যাব। আগামীকাল। কিন্তু আসলে দুজনেই যাব। ফোন লাগালাম, একজন মহিলার গলা পেলাম, জিজ্ঞাসা করলো — “কাকে চাই?”

আমি জিজ্ঞাসা করলামঃ “সুনীতা আছে? ও আমাকে চেনে। ওর সাথে আগামীকাল দেখা করতে বলেছিল।”

মহিলা বলল — “আসুন।”

“কিন্তু আপনাদের বাড়ী তো চিনিনা, কোথায় যাব?”

“পায়রাডাঙ্গা স্টেশনে নেমে রিকশাওলাকে বলবেন — তারা সুন্দরী প্রাইমারি স্কুল। স্কুলের উল্টো দিকের গলির চার নম্বর বাড়ী।”

“ কাল কথা হবে।”  ফোন কেটে দিলাম, বেশি বললেই বেশি হ্যাজাবে।

সুব্রত বলল — “ কিরে কি বুঝলি?”

“বুঝলি সুব্রত, শালা, চতুর্দিকেই এই মধুচক্রের ব্যাবসা ছেয়ে গেছে। তো ঐ কথাই রইল। আগামী কাল তিনটে নাগাদ এখানেই দু’জনের দেখা হবে, তারপর অপারেশন সুনীতা।

পায়রাডাঙ্গা পৌঁছতে পৌঁছতে পাঁচটা বাজলো। রিকশা ধরে বললাম — তারা সুন্দরী প্রাইমারি স্কুল।

এটা একটা গ্রামীণ জনপদ। সাধারণ, খেটে খাওয়া মানুষের ছোট ছোট পুতুলের সংসার। টালির চালের বাড়ি, একটু ভেরেন্ডার কি নিশিন্দের গাছের বেড়া দিয়ে ঘেরা। চালে লকলকে কুমড়ো বা লাউ গাছ। বাড়ির পাশে একটা দুটো সজনে কি কলা গাছ। মাঝে মাঝে একটা কি দুটো পাকা বাড়ী। তারা সুন্দরী প্রাইমারি স্কুলের সামনে নামলাম। নির্দিষ্ট বাড়িটার সামনে পৌঁছলাম। একটা পাকা একতলা  বাড়ী। নাম — “শান্তি ধাম”।

সুব্রত বলল — “রমেন দা, নামের বাহার দেখেছ, এরপর হয়তো দেখবে সোনাগাছির নাম বদলে আনন্দ ধাম হবে। তবে এটা গেরস্ত বাড়ী মনে হচ্ছে। এখনও সময় আছে কেটে পড়ি চল।”

আমার তখন রোখ চেপে গেছে। বললাম — “এত ভয় খাস না। ওপরে ফিটফাট তলায় রানাঘাট। এরাও হাফ গেরস্ত, কিছু হলে তোর সাংবাদিকের কার্ড তো আছেই।”

আস্তে করে ডাকলাম — “সুনীতা, সুনীতা আছো?” দরজা খুলে এক বয়স্কা মহিলা উঁকি মারল —  বিধবা। দরজা খুলে বলল — “ভিতরে এসে বসুন।”

ঘরটায় দুটো জানালা। দুটো বেতের চেয়ার রাখা। একপাশে একটা তক্তপোষ। জানলা দিয়ে বাগানের জুঁই গাছের একটা লতা ভেতরে মুখ বাড়িয়েছে। সাদা দেয়াল। একটা শো-কেশ। তাতে কটা গল্পের কবিতার বই আর একটা গীতবিতান রাখা। তিন চারটে মেমেন্টো রাখা। কোনায় একটা তানপুরা কাপড়ে ঢেকে রাখা।

শো-কেস এর উপরে একটা মেয়ের ছবি চোখে পড়লো, ফর্সা গায়ের রঙ, বছর একুশ-বাইশ বয়েসের, একটা সালোয়ার কামিজ পরনে, মুখটা খুব মিষ্টি। বিকেলের রোদের মত একটু আদুরে আলো লেগে আছে মুখ খানিতে। প্লাস্টিকের ফ্রেমে আটকানো। মনটা বেশ খুশি হয়ে উঠলো। মালটা চাঙ্গা।

মহিলা বলল — “সুনীতা, আমার মেয়ে, তা তোমরা ট্রেন-এ  ফোন নম্বর দেখে আসছো না?”

কি আর বলব — বললাম হ্যাঁ।

“ঠিক আছে, বস, আমি একটু আসছি।”

মহিলা চলে যেতে সুব্রতকে বললামঃ “দেখেছিস, মা-মেয়ে মিলেই কারবার খুলেছে। তা মেয়েটা দেখতে কিন্তু মন্দ না, গান-টান ও করে। বেশ চাকুম চুকুম আছে।”

সুব্রত বলল — “বন্ধু ভালোই মস্তি হবে মনে হচ্ছে।”

মহিলা ভেতরে গেল তা প্রায় পাঁচ মিনিট হয়ে গেল। বসে আছি। একটু অস্বস্তি ও হচ্ছে। এমন সময় মহিলা বেরিয়ে এলেন। একটা পুরানো খবরের কাগজ আমার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল — “এইটা পড়ুন, এই জায়গা টা।”

দেখলাম, প্রায় বছর খানের আগের একটি বাংলা কাগজ, পাতা হলুদ হয়ে গেছে। ভেতরের পৃষ্ঠায় একটা খবর লাল কালি দিয়ে ঘেরা। খবরটা অনেকটা এরকম ছিল বুঝলি —

“সুনীতা দাস নামে পায়রাডাঙ্গার একজন একুশ বছরের তরুণী গতকাল ঘরের সিলিং ফ্যান থেকে ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। মেয়েটি রানাঘাট কলেজে সেকেন্ড-ইয়ারে পড়তো। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে যে, মেয়েটিকে ফোন করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মানুষ কু-প্রস্তাব দিচ্ছিল। বিভিন্ন ট্রেনের কামরায় কে বা কারা মেয়েটির নাম ও ফোন নম্বর লিখে রেখেছিল। লিখেছিল যে মেয়েটি কলগার্ল-এর কাজ করে। মেয়েটির মা জানায় যে এই ঘটনার জেরে গত কয়েকদিন ধরেই মেয়েটি তীব্র অবসাদ এ ভুগছিল। গতকাল তিনি ও তার স্বামী একটি অনুষ্ঠান বাড়িতে বেরিয়ে গেল ফাঁকা বাড়ীতে মেয়েটি আত্মহত্যা করে। তার সুইসাইড নোটে মেয়েটি লিখে গেছে — “মা বিশ্বাস করো আমি খারাপ মেয়ে নই।” এলাকায় তীব্র উত্তেজনা রয়েছে। ঘটনার পরে মেয়েটির বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এলাকাবাসীর বক্তব্য মধ্যবিত্ত পরিবারের এই মেয়েটি অত্যন্ত ভদ্র ও মেধাবী হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিল। পুলিশ জানিয়েছে ঘটনার তদন্ত চলছে।”

খবরটা পড়া শেষ হলে আর চোখ তুলতে পারছিলাম না। শুনলাম মহিলা স্বগোতোক্তির মত করে বলছে — “মেয়েটাকে লোকেরা রাত দিন বিরক্ত করত, জিজ্ঞাসা করত রেট কত, আরো খারাপ খারাপ কথা। পুলিশ, প্রধান সবাইকে জানিয়ে ছিলাম। সবাই আমার মেয়েটাকেই দোষ দিল। ও এত ভাল গান করতো। রাত-বিরেতে ফোন আসা শুরু হল।  শেষদিকে খুব মনমরা হয়ে গেছিল। ওর দাদা বাইরে চাকরি করে। ওর জন্যেই ফোনটা নেওয়া। সুনীতা খুব সুন্দর গান করতো জানেন, কত প্রাইজ পেয়েছিল। শেষ দিকে ও বাড়ী থেকে বেরোত না। ফোন বাজলে চমকে চমকে উঠত। আমরা লোককে কত বলতাম, ফোন না করতে অনুরোধ করতাম। সবাই মজা করতো। বাজে বাজে গালাগালি দিত। তারপর এই ঘটনা। ওর বাবাও অসুস্থ হয়ে পড়লো। সাতদিন পরে সে মানুষ টাও চলে গেল। এবার আমাদের রেহাই দিন, সুনীতা তো আর নেই।”

মহিলা ছবিটা বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলো। ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনে হল সুনীতা বলে মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে মনে হল। মনে হল এক অসহায় মাযের কত দিনের হাহাকার এই ঘরের মধ্যে জমা হয়ে আছে। এখানে এই বাড়িতে সেই তরুণী মেয়েটির কত গান জমা হয়ে আছে। মনে হল ওর মৃত্যুর জন্য আমিও একই ভাবে দায়ী।

আস্তে আস্তে আমি আর সুব্রত ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। তখনও বুঝলি সেই বুক-ফাটা কান্না কানে বাজছে। সেদিন একটা ঘোরের মধ্যে বাড়ী ফিরেছিলাম। তারপর থেকে বুঝলি যেখানে এমন লেখা দেখি মুছে দিই।

রমেন দা দেখি ব্যাগ থেকে একটা ব্লেড বের করে লেখাটা একটু একটু করে উঠিয়ে দিতে থাকলো। শুভ বললঃ “রমেন দা, তুমি না শালা একটা ফালতু লোক, একটা বাজে লোক, এমন করে বলো না, শালা মন খারাপ করে দাও।” দেখি ওর চোখে জল চিক চিক করছে। সুদীপ, সৌরভ ও দেখলাম ট্রেনের বাইরের দিকে তাকিয়ে, লোনা জ্লের কিছু আভাষ সেখানেও।

আমার চোখটাও এত কড়কর করছে। মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে রুমাল বের করলাম।

HT: শিবনাথ পাল

মন্তব্য দিন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: