হাই-টি মিটিং

তখন আমাদের রিজনাল ম্যানেজার গোয়েল সাহেব নিজের কেবিনে বসে ফাইল সই করছেন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাড়ী যাবার সময় হয়ে এসেছে। ড্রাইভারকে তলব করা হয়ে গেছে। এমন সময় ফোন বাজে। জোনাল অফিস থেকে। ফোন করেছে জোনাল ম্যানেজারের P.A.। জোনাল ম্যানেজার সাহেব আগামী কাল ভিজিটে আসছেন। রিজনাল অফিসে পোঁছাতে প্রায় বিকেল ৪টে বেজে যাবে। ফোন পেয়েই গোয়েল সাহেব ব্যস্ত হয়রে পড়লেন, আমাদের সবাইকে ডেকে খবরটা দিলেন। আর প্রস্তুতির আদেশ, সেটা বলা বাহুল্য। শহরের সব ম্যানেজারদেরকে জানানো হোল। কাল বিকেলে তারাও যেন আসে। মিটিং হবে।

কিন্তু একটু সমস্যা হয়ে গিয়েছে। P.A. সাহেব জানিয়েছে বিকেলে সাহেব পৌঁছানোর পরে হাই-টির  ব্যবস্থা  করতে। আমাদের ছোট শহরে এই রকম ব্যাবস্থা মুশকিল। গোয়েল সাহেব আবার ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন হাই-টিতে কি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সে জানালো চায়ের সাথে কাজু, সিঙ্গারা, পেস্ট্রি ইত্যাদি। জোনাল ম্যানেজার আমাদের সবার বার্ষিক সমীক্ষা অনুমোদন করেন। তাকে তো খুশী করতেই হবে। সবাই মিলে কালকের মেনু ঠিক করা হোল — চা, কাজু, শিঙ্গাড়া আর বিস্কুট। আমাদের এই ছোট শহরে পেস্ট্রি পাওয়া যায় না। কেক কেটে পেস্ট্রি করার আইডিয়াটা অবশ্য মাথুর সাহেব দিয়েছিলেন।

সাক্সেনাজী বললেন এখানের ইয়াসিনের কাবাব খুব বিখ্যাত। আর বিকেলে তাজা বানায়। জোনাল ম্যানেজার যখন আমিষ খান, তখন ওই কাবাব মেনুতে রাখা যেতে পারে। ইয়াসিনের কাবাবের নামে আমাদের অনেকের মুখে জল এসে গেছে, তাই মেনুতে কাবাব জুড়ে দেওয়া হোল।

পরের দিন পুরো রিজনাল অফিস পরিষ্কার করা হোল, বাইরে কোন ফালতু কাগজ বা ফাইল নেই। রিজনের পারফরমান্স রিপোর্ট তৈরি হোল পাওয়ারপয়েন্ট-এ। গোয়েল সাহেব নিজেই বার বার দেখছেন আর চার্টগুলো এদিক-ওদিক থেকে সমন্বয় করার চেষ্টা করছেন যাতে দেখতে ভালো লাগে। যথারীতি বিকেল চারটের নাগাদ বড়ো সাহেব এসে পোঁছালেন। পড়ে সাড়ে পাঁচটার থেকে সব ম্যানেজারদের সাথে মিটিং করবেন হাই-টিতে। ভাটিয়াজির উপরে সব আয়োজনের দায়িত্ব। ভাটিয়াজি খুব উদ্দীপনা নিয়ে ব্যবস্থা করেন।

আমরা সকলে দৈনিক কাজ মোটামুটি শেষ করে মিটিঙের জন্য প্রস্তুত। আজকে কাজের থেকে বেশী জোনাল ম্যানেজারের আগমন নিয়ে প্রস্তুতি আর চর্চাটাই বেশী হয়েছে, সেটা বলা বাহুল্য। রিজনের পারফরমান্স দেখে বড়ো সাহেব খুশী হয়েছেন। তবুও ডিপোজিট, লোণ ইত্যাদি বিষয় টিপ্পনী করেছেন। সেতো আমরা জানি সব মিটিঙে এইরকম হয়। তারপর পরিশ্রমের উপর বক্তৃতা। ইতিমধ্যে চা, কাজু, শিঙ্গাড়া, বিস্কুট এসে গেলো আর সাথে সাথে এলো ইয়াসিন ভাইয়ের কাবাব! সবাই খুব আনন্দ করে খাচ্ছে আর কথা হচ্ছে। জোনাল ম্যানেজার কাবাব খেয়ে খুব খুশী, বললেন “সত্যি খুব স্বাদিস্ট।” গোয়েল সাহেব নিজে নিরামিষাশী কিন্তু বড়ো সাহেব খুশী বলে উনিও খুশী। ভাটিয়াজিকে প্রশিংসা করলেন আর সাক্সেনাজিকেও — এই কাবাবের আইডিয়া দেবার জন্য।

মিটিং তখন শেষ, সবাই খুশী। কিন্তু কথার ছলে শর্মাজী হটাৎ করে বলে বসলেন যে উনি মাংস খান না তবে নাকি শুনেছেন যে ইয়াসিন ভাইয়ের কাবাবে বীফ — মানে মহিষের মাংস — থাকে। তাই বলে সবাই বলে নাকি বেশী সুস্বাদু! বলা মাত্রই উনি নিজের ভুল বুঝেছেন, কিন্তু কথা একবার মুখ থেকে বের হলে আর ফেরৎ আসেনা। কথা যতই সঠিক হউক না কেন ভুল জায়গায় সেটি হয় মারাত্মক। সেই জন্য কোন কথা বলার আগে স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা করা খুবই প্রয়োজন। শর্মাজীর কথা শুনে পুরো ঘর নিঃশব্দ হয়ে গেলো। কারোর মুখে আর কথা নেই, হাসির রেশমাত্র উড়ে গেলো। গোয়েল সাহেবের মুখ রক্তিম বর্ণ হয়ে গেছে — লজ্জায় না রাগে, জানিনা।

ভাটিয়াজীর সামনে প্রোমোশন, এক মাস পরে ইন্টার্ভিউ। ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে, গেলো এবার তার প্রোমোশন হাতছাড়া হয়ে। সাক্সেনাজী কোনায় দাঁড়িয়ে মাথা পিটছে, আর বলছে বিড়বিড় করে — “কেন যে কাবাবের আইডিয়া দিতে গেলাম”। সাক্সেনাজী লোণ ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার। বলছেন কাল জোনাল ম্যানেজার ফিরে গিয়ে কোন খারাপ লোণের কেসের উপর তাকে না মেমো দেন।

ধীরে-ধীরে আমরা সবাই চুপচাপ মাথা গুঁজে, আগামী দিনের আসন্ন বিপদের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করতে করতে বাড়ী ফিরে গেলাম। আমাদের সবার বার্ষিক কার্য্য-সমীক্ষা জোনাল ম্যানেজারের হাতে। এবার কি জানি কি হবে!

মন্তব্য দিন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: