ক্লোজিং উৎসব

আজকাল ব্যাঙ্কে সব কম্পিউটার লেগে গেছে। সব ব্যাঙ্কেই এখন কেন্দ্রীভূত ব্যাংকিং চলছে। ব্রাঞ্চ যেখানেই থাক না কেন প্রধান বই খাতা ব্যাঙ্কের কম্পিউটারে কেন্দ্রীভূত। আজকাল তাই সেই ক্লোজিং মহোৎসব লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। সেই ব্যাংকিংও নেই, সেই মজাও আর নেই।

বহু বছর পূর্বে, তখন আমি সদ্য ব্যাঙ্কে চাকুরীরত। সেই সময় ব্যাঙ্কের সমস্ত কাজ হাতেই করা হতো। ৩১ ডিসেম্বর বার্ষিক ক্লোজিং আর ৩০ জুনে হতো  অর্ধ-বার্ষিক ক্লোজিং। এই দুই দিন ব্যাঙ্কের স্টাফদের জন্য কার্য্যদিবস, অথচ জনগনের জন্য অবকাশ। ব্যাঙ্কের ভিতরে দরজায় খিল দিয়ে বা চেন বেঁধে স্টাফেরা কাজ করছে, আর বাইরে একটা নোটিস লাগানো থাকতো — “আজকে ব্যাঙ্ক অবকাশ”।

গত ১০-১২ দিন ধরে খুব কাজ গেছে। সব লেজারে, সব অ্যাকাউন্টে ইন্টারেস্ট পোস্ট করা হয়েছে, তারপরে ব্যালেন্স মেলানো হয়েছে। সব খাতা, অ্যাকাউন্ট না মিললে আবার ব্যালেন্স শিট বানানো যাবেনা। তার উপর নানা টার্গেট — ডিপোজিট, লোণ, লাভ, ইত্যাদি। সব টার্গেট পুরো করতে হবে। কেউ যেন কম নয়। শেষ দিনে কিছু ব্যাবস্থা করে টার্গেট পুরো করা হয়। ম্যানেজার ব্রাঞ্চের এই দিনের জন্য কিছু জোগাড় রাখে, প্রয়োজনে ব্যাবহার করে।

টার্গেট হয়ে গেছে, খিল তোলা দরজার পিছনে সেই ক্লোজিং মহোৎসবের শেষ দিন। ব্যালেন্স শিট ইত্যাদি তৈরি হতে তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আজকের দিনে সবাই সমান — ম্যানেজার, ক্যাশিয়ার, ক্লার্ক, চাপরাশি সবাই এক সাথে কাজ করছে, আড্ডা মারছে, খাবার খাচ্ছে। পুরো ব্রাঞ্চটাই তো আমাদের একটা পরিবার। ভেদ কিসের?

আজকে তো প্রধান অনুষ্ঠানের দিন! গুপ্তাজী সকাল থেকে ব্যাবস্থাপনায় ব্যাস্ত। তার নিজের কিছু চেলাদের নিয়ে লাঞ্চ আর ডিনারের ব্যাবস্থা করছে। আবার ডিনার পার্টিতে বিশেষ করে মদের ব্যাবস্থা আছে। ও না হলে কিছু ছেলে তো  কাজেই হাত লাগাবে না। লাঞ্চে হবে মাংস আর পনীর আছে নিরামিষাশীদের জন্য। মহাভোজ!

মালহোত্রা সাহেব তো হটাৎ গলা ঝেড়ে মান্না দের গান ধরলেন। এদিক-ওদিক থেকে দুইজন টেলার কাউন্টারে তাল ঠুকে সাথ দিতে শুরু করলো। মিশ্রাজী নিজের ডেবুক মেলাতে ব্যাস্ত। তারপরে ট্রায়াল ব্যালেন্স, ব্যালেন্স শিট, লাভক্ষতির খাতা। অনেক কাজ। বিকেল গড়াতে না গড়াতে রিজনাল অফিস, জোনাল অফিস থেকে ফোন আসা শুরু হয়ে যাবে। আজকে মিশ্রাজীর খুব দাম। আমাদের ব্রাঞ্চের সহায়ক প্রবন্ধক ভাটিয়াজী মিশ্রাজীকে নিজের চেয়ারে বসেই জিজ্ঞেস করলেন — “মিশ্রাজী আপনা ফিগার বাতাইয়ে। টাকলা পুঁছ রাহা হ্যায়।” টাকলা হোল গোয়েল সাহেব — আমাদের রিজনাল ম্যানেজার। মিশ্রাজী পান খেতে খেতে, হিসেব করতে করতে উত্তর দিলেন — “৩৬-৩৬-৩৬।” এই নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ খুব মজা, ইয়ার্কি  চললো।

খালি মিশ্রাজী একা ব্যাস্ত নয়। সাক্সেনাজীও ব্যাস্ত। লোনের সব ফাইল, ঠিক করছেন, লিমিটেশন চেক করছেন। তার উপর আবার অডিট শুরু হবে, সব ফাইল চেক হবে। ওনার সাথে আছে মাহাতোদা। মাহাতোদা আমাদের ব্যাঙ্কের দফতরি। অনেক পুরানো স্টাফ। ব্যালেন্স শিটের সাথে অনেক রিপোর্ট পাঠাতে হয়। বেশী লম্বা রিপোর্টগুলো লোন ডিপার্টমেন্ট থেকেই তৈরি হয়। তখন সন রিপোর্ট, রিপোর্টের কপি হাতেই তৈরি হতো। ফটোকপি চলবেনা। অর্ধেক ব্রাঞ্চ আজকে রিপোর্ট কপি করতে লেগে আছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। রিপোর্ট তৈরি প্রায় শেষ। কপি যা একটু বাকি আছে। গোয়েল সাহেব কে আমাদের ম্যানেজার শর্মাজী ফ্যাক্স করে পাঠিয়ে দিয়েছে ইতিমধ্যে। টার্গেট পূর্ণ হয়েছে। তাই আমাদের ব্রাঞ্চের উপর গয়েল সাহেবও খুশী হয়েছেন। সাহেব খুশ তো হাম ভি খুশ।

তখন প্রায় রাত আটটা। কাজ মোটামুটি শেষ। রামলাল কে পাঠানো হয়ে গিয়েছে হেড পোস্ট অফিসে। হেড অফিসে কি ফিগার্স টেলিগ্রাম করতে। ধীরে-ধীরে হুইস্কির বোতল বের করা হোল। মহিলা স্টাফেরা বাড়ি চলে গিয়েছে। এখনই তো পার্টির মজা। বন্ধনহীন আনন্দ। শেষে বাড়ি ফিরে টিভিতে মধ্য রাত্রের নিউ ইয়ার ইভ  প্রোগ্রাম দেখা।

কাল থেকে নতুন বছর। আবার নতুন টার্গেট, পুরানো কাজ। এখনো মাঝে মাঝে ভাবি সেই দিনগুলির কথা। সত্যি, সেই ফেলে আসা দিনগুলির মতো আর আজকাল আনন্দ নেই। শেষ হয়ে গিয়েছে ব্যাঙ্কের সেই ক্লোজিং উৎসব। একাকীতে মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই পুরানো দিনের হারানো কথা।

2 thoughts on “ক্লোজিং উৎসব

মন্তব্য দিন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

w

Connecting to %s

%d bloggers like this: